আলো আঁধার আর ভারতবর্ষ

বুকে বড় যন্ত্রণা! ভারতবর্ষ কি কেবল ধনী আর শিক্ষিত মধ্যবিত্তের?

শেষ কয়েক দশকে ভারত এগিয়েছে। কিন্তু ভারতের কৃষক, মজুর, দরিদ্র্যশ্রেণী এরা কি এগিয়েছে? ধনী নিঃসন্দেহে আরও বেশি ধনী হয়েছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের রোজগার আর জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। কিন্তু অশিক্ষিত দুর্বল দরিদ্র্য মানুষ- এখনো সেই একই নরকে।

ধনীরা এদের খবর রাখে না। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবীরা কখনো কখনো এদের দারিদ্র্যকে দেখেও দেখে না। কেউ কেউ আবার​-​ এইসব দরিদ্র্য মানুষের অস্তিত্ব​কে স্বীকারই করে না​। মিডিয়া এদেরকে নিয়ে ​খুব বেশি ​খবর করে না। ঘাটাল এবং ঘাটাল সংলগ্ন কুড়ি লক্ষ মানুষ যখন দেড় মাস ধরে বন্যার জলে ডুবে ​থেকে ​অনাহার অসুস্থতায় ​হাহাকার আর আর্তনাদ করলো, তখন ​সরকার আর মিডিয়া দুইই চোখ বুজে সম্রাট নীরোর মতো বীণা বাজাচ্ছিলো।​

গুজরাট, মহারাষ্ট্র ইত্যাদি রাজ্যে কৃষক দরিদ্র্য​ আর দলিতের আন্দোলন- মানুষের এই অসহায়তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ভারত এগোচ্ছে অথচ দরিদ্র্য ​দলিতরা ​একই রকম অন্ধাকরে রয়ে যাচ্ছে- এই নিয়ে মনমোহন সিং সরকারের আমলে​, ​ আমি ​বেশ ​কিছু ডিবেট শুনেছি। ​"সেই সব ​ডিবেট​"​ ধনী আর শিক্ষিত মানুষের কাছে এক ধরণের ​"​বিনোদ​নের রূপ" নিয়েছে বা তাদেরকে টিভিতে মুখ দেখানোর সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু সেই সব ডিবেট সরকারী নীতিতে কোন পরিবর্তন আনতে পারে নি।

আজ প্রায় দশ বছর হলো, আমি আমার সীমিত ক্ষমতায়- ভারতের এই "অসুস্থ" উন্নয়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছি। ভারতের এই উন্নয়নকে আমি অসুস্থ উন্নয়ন (DISRUPTIVE DEVELOPMENT)বলছি কেন? যে উন্নয়ন- বিভিন্ন শ্রেনীর মধ্যে আরও বেশি তফাৎ গড়ার মাধ্যমে, সামাজিক আর অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরী করে; সেই উন্নয়ন অসুস্থ তো বটেই। এই ধরণের উন্নয়ন মানুষে মানুষে সংঘাত তৈরী করে দেশকে নারকীয়তার দিকে ঠেলে দেয়।

আজকের মহারাষ্ট্র, গুজরাট ইত্যাদি রাজ্যে যে অস্থিরতা তৈরী হয়েছে, তার বীজ বপন আর পালন কিন্তু ১৯৪৭ সাল থেকেই চলছে। জাতিভেদ প্রথা, জাতপাতের রাজনীতি, জাত ভিত্তিক "তপশীলি", "উপজাতি" ইত্যাদি নির্ধারণ, ধর্ম ভিত্তিক ভোট ব্যাঙ্কের রাজনীতি- ইত্যাদি সবই কিন্তু মানুষে মানুষে বিভেদ ক্রমশঃ বাড়াচ্ছে। সারা পৃথিবী যেখানে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি নির্ভর সমাজব্যবস্থা আর সংস্কৃতি গড়তে ব্যস্ত, আমরা তখন কাউকে ডাইনি অপবাদে, কাউকে দলিত অপবাদে নৃশংস ভাবে খুন করছি। আমরা কি তবে আলোর দিকে না হেঁটে অন্ধকারের দিকে হাঁটছি?

ভারত খুব শীঘ্র (২০৫০ সাল নাগাদ)বিশ্ব শ্রেষ্ঠ হওয়ার স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্ন কিন্তু খুব বেশি অবান্তর নয়। কিন্তু আমি যদি ভারতকে আজকের সামাজিক, অর্থনৈতিক আর বিজ্ঞান চেতনার মাপকাঠিতে মাপি; তাহলে বলবো- ভারতের সেই স্বপ্ন কখনো পূরণ হবে না। কেন?

চিন্তা করার ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, যুক্তিবোধ, বিজ্ঞান চেতনা- এগুলো হলো কোন জাতির উত্তরণের মৌলিক উপাদান। "প্রাচীন ভারতবর্ষ" পৃথিবীতে এক "SUPER POWER" ছিলো। কেন? কারন- প্রাচীন ভারতবর্ষ ​বিজ্ঞান দর্শন আর মননে- "SUPER POWER" ছিলো। ​আমাদের আর্যভট্ট, বৌধায়ন, ব্রহ্মগুপ্ত, ভাস্করাচার্য্য, মহাবীরাচার্য্য, কণাদ, শুশ্রুত, চরক, বরাহমিহির, নাগার্জুন ইত্যাদি জগৎশ্রেষ্ঠ মহামানব ছিলেন। বিজ্ঞান আর সৃজনশীলতা ছাড়া কোন জাতি কখনো পৃথিবী শ্রেষ্ঠ হতে পারে নি। আর ভবিষ্যতেও পারবে না। এই কারনেই বিজ্ঞান আর সৃজনশীলতা​কে উন্নয়নের মূল হাতিয়ার বলে। ​

যে জাতি ডাইনি অপবাদে নারী খুন করে, ধর্ম আর জাতপাতের ভিত্তিতে নিজেদের বিরুদ্ধে লড়াই করে; সেই জাতি বিশ্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার জন্য এখনো তৈরী নয়। ভারত সরকার আর সমস্ত ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আমার প্রশ্ন-
১. মানুষে মানুষে বিভেদ কমানো যেখানে কাম্য, সেখানে জাত আর ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি কেন? এই ধরনের রাজনীতি কি মানুষে মানুষে আরও বেশি বিভেদ গড়ছে না? একদল ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে বিদ্বেষের বিষ ছড়ায়। আর একদল সংখ্যাগুরুর স্বার্থ রক্ষার নামে বিদ্বেষের বিষ ​ছড়ায়। দুই পক্ষই কিন্তু একই ধরণের পাপী। ​​
২. ধনী আরও বেশি ধনী হচ্ছে। তবে গরীবরা কেন একই অন্ধকারে? ভারতের উন্নয়নে কেন গরীবদের অংশীদারী থাকবে না? গরীবরা কেন ভারতবর্ষের শ্রীবৃদ্ধি​র আলো থেকে বঞ্চিত হবে?
৩. ​​গরীবদের​ ক্ষমতায়ন, শিক্ষায়ন, চেতনার জাগরণ ইত্যাদির জন্য ভারতবর্ষের স্বল্প মেয়াদী আর দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা কি? আগের পরিকল্পনাগুলো এতো ব্যর্থ কেন? তার দায় কার? দোষীদের শাস্তি হবে না কেন? কোটি কোটি দরিদ্র্য দুর্বল মানুষকে যুগ যুগ ধরে রগড়ে রগড়ে যন্ত্রণা দেওয়ার জন্য, দোষী রাজনৈতিক নেতাদের শাস্তি হবে না কেন?
৪. ​শিক্ষার মান উন্নয়নে দেশের ব্যর্থতা কেন? তার প্রতিকার পরিকল্পনা কি?
৫. ​স্বাস্থ্যের মান উন্নয়নে দেশের ব্যর্থতা কেন? তার প্রতিকার পরিকল্পনা কি?
৬. ​​বিজ্ঞান চেতনার মান উন্নয়নে দেশের ব্যর্থতা কেন? তার প্রতিকার পরিকল্পনা কি?
​৭. কেন ভারতে বলার মতো কোন মৌলিক গবেষণা নেই? আবিষ্কার নেই? তার প্রতিকার পরিকল্পনা কি?
৮. ভারতকে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি শ্রেষ্ঠ করতে আমাদেরস্বল্প মেয়াদী আর দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা কি? আগের পরিকল্পনাগুলো এতো ব্যর্থ কেন? তার দায় কার? দোষীদের শাস্তি হবে না কেন?
৯. অপদার্থতার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের শাস্তি হবে না কেন?
১০. জাত আর ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ করতে সংবিধান সংশোধন করে কড়া আইন আনা হবে না কেন?

আজ এখানেই থাক। আপনারা ভাবতে থাকুন। আমিও আরো ভাবতে থাকি।

© অরুণ মাজী

by Arun Maji

Comments (1)

Beautiful composition