ন্যাংটো রাজার ন্যাংটো প্রজা আমরা। কে কাকে ন্যাংটো বলবে? (Essay On Slavery In India)

মানুষ আর তার জাগরণের মাঝখানে একটা উঁচু পাহাড় আছে। সেই পাহাড়কে মানুষের চিন্তার শক্তি দিয়ে জয় করতে হয়।
একটা জাতি আর তার জাগরণের মাঝখানেও একটা উঁচু পাহাড় আছে। সেই পাহাড়কে সেই জাতির জনগণের চিন্তার শক্তি দিয়ে জয় করতে হয়।

১৯৯৯ সালের জুন বা জুলাই মাস হবে সেটা। আমি তখন কার্গিল যুদ্ধে একটা ইনফ্যান্ট্রি ইউনিটের ডাক্তার। একদিন ইউনিটের CO (কমান্ডিং অফিসার)আর আমি, একটা পোস্ট পরিদর্শনে গেছি। দেখলাম- যেখানে AGL gun (অটোমেটিক গ্রেনেড লঞ্চার)ডিপ্লয় করা আছে, তার সামনের গাছগুলোকে কেটে ফেলা হয়েছে।CO রেগে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-
"সুবেদার সাব, আপলোগ পের কিঁউ কাট দিয়া? পের-সে হামলোগকো CAMOUFLAGE (আড়াল)মিলতা থা। আপলোগ সোচতা নেহি কেয়া? "
তো পোস্ট কমান্ডারের উত্তর-
"সাহাব, সোচনা অফসার (OFFICER)লোগোকা কাম হ্যায়। হামারা নেহি।"

প্রায় কুড়ি বছর আগের এই ঘটনা। তবুও ঘটনাটা আমার বেশ মনে আছে। কেন জানো? সেই পোস্ট কমান্ডারের উত্তর, সেদিন আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলো দাসত্ব (SLAVERY)কাকে বলে! মানুষ চাকরগিরি বা তোতাপাখির মতো নকল করতে শিখেছে। কিন্তু নিজে নিজে চিন্তা করতে শেখেনি। আমরা এতটাই হীন আর নির্লজ্জ্য যে, সেই দাসত্বের কথা বুক ফুলিয়ে বলতে আমরা দ্বিধা করি না।

মুঘল শাসন শেষ হয়েছে। ইংরেজ শাসন শেষ হয়েছে। নেহেরু শাসন শেষ হয়েছে। তবুও আমরা এখনো অন্যের গোলামি করে যাচ্ছি। এই SLAVE MENTALITY (দাসত্ব প্রবণতা) -র জন্যই, নেহেরুর বংশধরদের আমরা এখনো রাজা বলে গণ্য করি। আর রাজ্যে রাজ্যে পরিবারতন্ত্র গড়ে উঠেছে।বৃষ্টি হলে বারাক ওবামা নিজের ছাতা নিজে ধরে হাঁটে। আর ভারতবর্ষে কি হয়? বৃষ্টি হলে- একজন কনস্টেবল তার উর্দ্ধতন- থানার ওসি সাহেবের মাথায় ছাতা ধরে। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে মানুষ হিসেবে সন্মান দেয় না। কনস্টেবল ওসি সাহেবের দাসত্ব করছে। এই দাসত্ব প্রতি মুহূর্তে পথে পথে তুমি দেখতে পাও। দাসত্ব যদি আমাদের রক্তে, তাহলে আমাদের জাগরণ হবে কবে?

একজন সত্যিকারের মানুষ নিজে নিজে চিন্তা করতে পারে। একজন চাকর কি নিজে নিজে চিন্তা করতে পারে? এই চাকরগিরি কি কেবল দরিদ্র্য দুর্বল অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ? নাহঃ। ভারতবর্ষে, হাভার্ড স্ট্যানফোর্ড থেকে পাশ করা মানুষও এই প্রকার চাকরগিরি করে। ছোট মন্ত্রী বড় মন্ত্রীর পা চাঁটছে। ছোট অফিসার বড় অফিসারের পশ্চাৎদেশ চাঁটছে। চারিদিকে কেবল কুকুরের মতো চাঁটাচাঁটি। সর্বত্র যদি এই দাসত্ব তো ভারতবর্ষ জাগবে কি করে?

চারিদিকে কেবল কুকুর আর তোতাপাখির মতো দাসত্ব। ধর্মগুরু বা রাজনৈতিক দাদারা বলছে- "ওরা খারাপ"। তো সাধারন মানুষ "ওদের" গলা কেটে দিচ্ছে। মানুষ ভাবছেও না- ১. ওরা খারাপ কেন? ২. মানুষের গলা কাটলে খারাপ মানুষ কি ভালো হয়ে যাবে? ৩. হত্যার মাধ্যমে কি কোন সমস্যার সমাধান সম্ভব?ইত্যাদি অতি আবশ্যক সব প্রশ্ন কেউই নিজেকে কখনো করে না।

যে জাতি কেবল নকল করে, নিজে নিজে চিন্তা করতে পারে না- তার জাগরণ কি ভাবে হবে?টেপ রেকর্ডারের মতো রেকর্ড করে যদি তা বাজাবে, তাহলে নিজেকে মানুষ বলো কেন? নিজেকে টেপরেকর্ডার বা তোতাপাখি বলতে পারো না?

সকলেই জানে এ এদেশের রাজনীতিকরা মূর্খ ভোঁদড় আর অকর্মণ্য। কিন্তু তারা একাই কি- মূর্খ ভোঁদড় আর অকর্মণ্য? শেয়াল দেশে শেয়াল রাজা হয়। সিংহের দেশে সিংহ রাজা হয়। আমাদের শেয়াল রাজা, তার কারন- আমরা নিজেরা নিকৃষ্ট মানের শেয়াল। আমরা নিজেরা যেদিন সিংহ হবো, আমাদের দেশের রাজাও সেদিন সিংহ হবে।

রাজনীতিকরা যদি মূর্খ ভোঁদড় আর অকর্মণ্য, তো তুমি নিজে- নিজেকে আর দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কি করেছো?

ধরো দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। সকলেই জানে- কি সাংঘাতিক নরক আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা! কিন্তু তুমি কি জানো- সেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ৭০% সমস্যা তোমরা নিজেরাই এক বছরের মধ্যে সমাধান করতে পারো? কিভাবে?

রোগ তো আর একদিনে হয় না। রোগের পটভূমি বছর বছর যুগ যুগ ধরে তৈরী হতে থাকে। তোমরা যদি দেশের মানুষকে "পাবলিক হেল্থ" বিষয়ে সচেতন হতে সাহায্য করো- তাহলেই দেশের স্বাস্থ্যের ৭০% সমস্যা এক বছরে মিটে যাবে। এতো কিছু ফেসবুক আর Whatsapp-এ শেয়ার করতে পারো, পাবলিক হেল্থ চেতনা তোমরা শেয়ার করতে পারো না? তোমাকে গড়া বা দেশকে গড়া কি কেবল সরকারের একার কর্তব্য? তোমার তাতে কোন দায়িত্ব নেই?

কোন সমস্যাকে যদি গভীর ভাবে খুঁড়ে দেখো তো দেখবে- সমস্যা হিমালয়ের বড় দেখালেও, তার উৎস কিন্তু ছারপোকার মতো ছোট্ট। তাকে যদি চিনতে পারো- তাহলে পাহাড় প্রমাণ সমস্যাও তুমি অতি সহজে মিটিয়ে ফেলতে পারো। ভারতবর্ষের ৭০ % স্বাস্থ্য সমস্যা, কেবল ভালো একটু পাবলিক হেল্থ ব্যবস্থার মাধ্যমে করা সম্ভব।

ন্যাংটো রাজার ন্যাংটো প্রজা আমরা। কে কাকে ন্যাংটো বলবে?

© অরুণ মাজী

by Arun Maji

Comments (1)

দাদা যত পড়ি তত ভালো লাগে