আন্ডারপ্যান্টে কাঁকড়া বিছে কিভাবে চৈতন্যের জাগরণ ঘটায় (How To Wake Up)

জীবনে কত নিয়ম, কত তত্ত্ব, কত মতবাদ, কতসত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব! এতসব পরস্পর বিরোধী তত্ত্ব আর মতবাদের মধ্যে ঘেঁটে ঘ হয়ে যায় না, এমন মানুষ কি পৃথিবীতে আছে?

কাকে বিশ্বাস করবে? কাকে অনুসরণ করবে? তুমি যে ধর্মকে ভালোবাসো, সেই ধর্ম​-​ হাতে রক্তের দাগ মাখছে। তুমি যাকে গুরু হিসেবে পূজা করো, সেও ধর্ষক হিসেবে জেল খাটছে। তুমি যে গ্রন্থকে পাথেয় মানো, তাও যুগযুগ ধরে বিকৃত হয়ে আসছে। তুমি তোমার নিজস্ব বিশ্বাসের উপরই বা আস্থা রাখবে কি করে? তোমার নিজস্ব বিশ্বাসও তো​, ​ তোমার লোভ আর স্বার্থ দ্বারা গড়ে উঠেছে! লোভ আর স্বার্থ দিয়ে যা গড়ে উঠে, তা তো তোমার সত্যিকারের হিতসাধন করবে না!

"ঘেঁটে ঘ" এ পৃথিবী। "ঘেঁটে ঘ" এ মানব বুদ্ধি। এতো ঘাঁটাঘাঁটি আর ঘন কুয়াশার মধ্যে তুমি তোমার জীবনের পথ নির্দেশ করবে কি করে?

​সেজন্যই আমি কাউকে বিশ্বাস করি না​, ​ কিছুই বিশ্বাস করি না। আমি আমার নিজেকেও বিশ্বাস করি না। আমি কেবল আমার নিজস্ব চিন্তার ক্ষমতাকে বিশ্বাস করি। তাও আবার সবসময় নয়। আমার চিন্তা যখন স্বার্থ দিয়ে আচ্ছন্ন থাকে, আমি আমার সেই চিন্তাকেও বিশ্বাস করি না। আমি তাই নিজেই নিজেকে বারবার চ্যালেঞ্জ করি। আমি নিজেই নিজেকে থাপ্পড় মারি। আমি নিজেই নিজের আন্ডারপ্যান্টে কাঁকড়া বিছে ঢুকিয়ে দিই। আপন অন্ডকোষে দগদগে ঘা না হলে, আমার চৈতন্য জাগে না।

চৈতন্য এমনি এমনি ঘটে না। চৈতন্য জাগরণের জন্য যন্ত্রণা পেতে হয়। লোকে যদি আমাকে খিস্তি আর হিংসার মাধ্যমে যন্ত্রণা দেয়; তো আমি খুব ভাগ্যশালী। সে সৌভাগ্য যদি না ঘটে, তবে আমি- নিজেই নিজেকে খিস্তি করি। নিজেই নিজের আন্ডারপ্যান্টে কাঁকড়া বিছে ছেড়ে দিই। সেই কাঁকড়া বিছে যখন আমাকে কুটুস কুটুস করে কাটে, তখন ফুটুস ফুটুস করে আমার চৈতন্য বিকশিত হয়।

এজন্যই আমি নিজেকে THOUGHT ANARCHIST (চিন্তার প্রলয়বাদী)বলি। "THOUGHT ANARCHIST" পদটা আমারই সৃষ্টি। আমি ভাবি- বিশ্বাস মানেই হলো একটা দেওয়াল। যে মুহূর্তে তুমি কোন কিছু বিশ্বাস করে ফেললে, সেই মুহূর্তেই তুমি- "তোমার বিশ্বাসের" বাইরেও যে মহাবিশ্বের অনন্ত সৌন্দর্য আছে, তা ​খোঁজা বন্ধ করে দেবে। বিশ্বাসের মতো ধ্বংসাত্মক​, ​ জীবনে আর কিছু হতে পারে না।

পৃথিবীর দিকে তাকাও- কি দেখছো? যে জাতি যত বেশি সংস্কারমুক্ত, সেই জাতি তত বেশি চিন্তাশীল আর সৃষ্টিশীল। পাশ্চাত্য দেশের অনেক খারাপ দিক আছে, তবুও এ কথা অনস্বীকার্য্য যে- পৃথিবীর যত শ্রেষ্ঠ দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, কলা, শিল্প- প্রায় সবই তাদের দখলে। শ্রেষ্ঠকে তো শ্রেষ্ঠ বলতেই হবে।

কিন্তু প্রাচীন ভারতবর্ষ? তার গল্প সম্পূর্ণ আলাদা। প্রাচীন ভারতবর্ষ তখন পৃথিবী শ্রেষ্ঠ ছিলো। আমাদের আর্যভট্ট, কণাদ, ধ্বন্বন্তরী, শুশ্রুত, চরক, গার্গী, মৈত্রেয়ী তখন পৃথিবী পূজ্য ছিলো। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন আমাদের ​নালান্দা​, ​ তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসতো। কিন্তু আজ- ভারতীয়রা বিভিন্ন দেশে পড়া​শুনার জন্য ছুটছে। আজ ভারতীয়রা "বিলেত ফেরত ডাক্তার" "বিলেত ফেরত উকিল" সাইনবোর্ড বুকে সেঁটে গর্ব বোধ করছে। হায় পোড়াকপাল! কি অধঃপতন এই ভারতবর্ষের!

​আমাদের ​এই অধঃপতন কেন?
১. প্রাচীন ভারতবর্ষ হিন্দু ধর্ম সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সেই হিন্দু ধর্ম সংস্কার সর্বস্ব ছিলো না। সেই হিন্দুধর্ম- চিন্তা (বা দর্শন)সর্বস্ব ছিলো। মৈত্রেয়ী ছিলো এক প্রাচীন নারী। উনিও দর্শন সম্পর্কিত বিতর্কে, ওনার স্বামী মহাঋষি যাজ্ঞবল্ক্যের কাঁছা খুলে দিতেন।

মুঘল ইত্যাদি প্রবেশের পর, ইসলাম ধর্মের আগ্রাসন থেকে বাঁচতে, হিন্দুরাও নিজেদেরকে ইসলাম ধর্মের মতো ​কঠিন ​সংস্কারে বেঁধে ফেললো। সেই থেকে শুরু হলো হিন্দু ধর্ম আর সংস্কৃতির অধঃপতন। হিন্দুরা আজও সেই সংস্কারগ্রস্ত মন থেকে মুক্ত হতে পারে নি।

২. সংস্কারগ্রস্ত মন যেহেতু নতুন সৃষ্টির পরিপন্থী, তাই মুঘল পরবর্তী যুগে ভারত উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারলো না। যেহেতু তারা নিজেরা শ্রেষ্ঠ হতে পারলো না, সেহেতু তারা অন্য শ্রেষ্ঠ দেশের "অন্ধ নকল" করতে থাকলো। ফলে ভারতবর্ষে সৃষ্টি হলো আত্মসন্মাহীন- পা চাঁটা, পাছা চাঁটা কৃমি কেঁচো উইপোকার মতো মানুষের। এরা "বিলেত ফেরত" সাইনবোর্ডে গর্ব বোধ করে। এরা যা কিছু বিদেশে তৈরী, তাই অর্জন করে ​নিজেদেরকে "উঁচু জাত" ​বলে দাবি করে।

৩. কারা অন্যকে শ্রেষ্ঠ ভেবে অন্ধভাবে নকল করে? যারা আত্মসম্মানহীন কাপুরুষ। ​আর ​যারা আত্মসম্মানহীন কাপুরুষ, তারা আপন লোভ আর স্বার্থের জন্য প্রতি মুহূর্তে অন্যায় আর মিথ্যাচারের কাছে মাথা ঝুঁকাবেই ঝুঁকাবে। ​কৃমি সে কৃমির মতোই আচরণ করবে। সে কি কখনো সিংহের মতো আচরণ করবে? ​

প্রশ্ন ১: বলিউড​-​ হলিউডের চেয়ে বেশি মুভি বানায়। ​তবু- একটাও ​বলিউড মুভি ​পৃথিবী শ্রেষ্ঠ নয় কেন?

কারন ভারতীয়দের শ্রেষ্ঠ হওয়ার কোন তাগিদ নেই। কৃমি কেঁচো উইপোকার মতো ​বাঁচতেও তারা লজ্জা পায় না। যদি আমাদের আত্মসম্মান থাকতো- তাহলে আমাদের বলিউড​, ​ ইতিমধ্যেই অনেক পৃথিবী শ্রেষ্ঠ মুভি বানাতে পারতো।

কারুরই শ্রেষ্ঠ হওয়ার কোন চেষ্টা নেই। সকলেই ব্যবসায় ব্যস্ত। কেউই অধ্যাবসায় দিতে চায় না। সকলেই লোক ঠকিয়ে বড় হতে চায়। রাজ্যের একটা মুখ্যমন্ত্রী- সেও লোক ঠকিয়ে "ডি লিট" উপাধি পেতে চায়। ​তারও ন্যূন্যতম লজ্জা আর সম্মানবোধ নেই! ​এই জঘন্য ঘটনা প্রমাণ করে- ভারত ​কেন আজও ​শ্রেষ্ঠ​ত্ব থেকে সহস্র মাইল দূরে। ​

প্রশ্ন ২: মধ্য এশিয়ার অনেক দেশ ভয়ঙ্কর ধনী হলেও- সে সব দেশ থেকে কেন উল্লেখযোগ্য নোবেল জয়ী নেই বা পৃথিবী শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার বা উদ্ভাবন ​নেই। কেন ​?

ইসলাম ধর্মে মুক্ত চিন্তার সুযোগ থাকলেও যুগযুগ ধরে ইসলাম ধর্মের বিকৃতি ইসলাম ধর্মকে ভীষণই সংস্কারগ্রস্ত করে ফেলেছে। সেজন্য ইসলাম অধ্যুষিত দেশ থেকে উল্লেখযোগ্য কোন আবিষ্কার বা উদ্ভাবন নেই।

হে ভাই আকাশ ছুঁতে চাও? পারবে। কিভাবে? নিজেকে সংস্কার আর বিশ্বাস মুক্ত রাখো। যে রাজনৈতিক দলকে ভালোবাসো, তাকেও সমালোচনা করতে শেখো। যে ধর্মকে ভালোবাসো, তাকেও সমালোচনা করতে শেখো। যে দেশকে ভালোবাসো, তাকেও সমালোচনা করতে শেখো। তবে সে সমালোচনা গঠনাত্মক এবং শ্রদ্ধামূলক হতে হবে। কেবল স্বার্থ আর লোভের জন্য সমালোচনা বা গালি করা চলবে না। তবেই তুমি পারবে- তোমার রাজনৈতিক দল, তোমার ধর্ম, তোমার দেশকে পৃথিবী শ্রেষ্ঠ করতে।

যারা অন্ধ রাজনৈতিক দল ভক্ত, বা অন্ধ ধর্ম ভক্ত- তারা তাদের নিজেরও ভালো করে না, তাদের ধর্ম বা দলেরও ভালো করে না, তাদের দেশেরও ভালো করে না। তারা হলো- এই পৃথিবী ধ্বংসের কারন।

© অরুণ মাজী

by Arun Maji

Comments (0)

There is no comment submitted by members.